বুকে ব্যাথা মুখে হাসি তার নাম প্রবাসী

বুকে ব্যাথা মুখে হাসি তার নাম প্রবাসী

বুকে ব্যাথা মুখে হাসি তার নাম প্রবাসী। বৈচিত্র্যময় মানুষের জীবনের নানা রুপ। বৈচিত্র্য এই জীবনে অতিবাহিত করতে হয় নানা অধ্যায় ও কাল। সাথে বিবর্তন হয় এই অধ্যায় ও কালের। আমাদের এই সীমিত জীবনে রয়েছে নানা উত্থান পতন, হাসি বেদনা, সুখ দুঃখ। এসবের প্রতিটি মূহুর্ত আমাদের জীবনকালের কানায় কানায় ভরা। আমাদের প্রত্যেকের মিলিত হওয়ার স্থান একটাই। আর সেটা হলো বার্ধক্য। আর বার্ধক্যে পৌঁছতে আমাদের জীবনে বহু কিছু বয়ে নিয়ে যেতে হয়।

মানুষের জীবন নানান রংতুলি দিয়ে আকাঁ। তুলি দিয়ে আকাঁ রঙিন জীবনের একটি কাল হচ্ছে প্রবাসকাল। সুখময় জীবনের ভিন্ন ভিন্ন সব কালে ভিন্ন রকম সুখের ছোঁয়া থাকলেও প্রবাস কালে সুখের দেখা মেলা বড়ই কঠিন একটি কাজ। অনেকেই আছেন যারা, পরিবারে সুখ-শান্তি, আর্থিক উন্নতি ও দেশের মঙ্গলের জন্য প্রবাস জীবনকে বেছে নিয়েছেন, মা বাবা ভাই বোন পরিবার পরিজন আত্মীয় স্বজন ও মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে প্রবাসে জীবন যাপন করছেন, কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছেন তাঁরা কেমন আছেন? 

যাদের সুখের জন্য আজকে সুখের বাহক সে মানুষগুলো প্রবাসী সেই প্রিয় মানুষগুলো কি জানে তাঁরা আসলে কতটা সুখী? রুপময় এই পৃথিবীর সকল মানুষ ভাবে প্রবাসীরা বোধয় দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ। কিন্তু তা কখনোই নয়। পৃথিবীতে যদি কেই সবচেয়ে দুঃখী হন তবে সেটা একজন প্রবাসী। তবুও মানুষ তাদের এত সূখী ভাবেন কেন জানেন? কারন, এ জন্য যে, একজন প্রবাসী সারা জীবন হাড়ভাঙ্গা কঠোর পরিশ্রম করলেও কখনো সে তার নিজের দুঃখের কথা কাউকে বলেনা। নীরবে নিবৃতে সহ্য করে যায় জীবনের সব ঘাত প্রতিঘাত। এ ব্যথা অন্য কারো বোঝার মত না। তাই কেও বুঝবেও না। আসলে যারা প্রবাসে বাস করেন শুধু তারাই উপলব্ধি করতে পারে প্রবাসীদের এই দুঃখ ও যাতনা।

প্রবাসীদের প্রিয়জনের সুখের খোঁজে নিজেদের নিমজ্জিত করেছেন অথৈ কষ্ট ও দুঃখের সাগরে। এই কষ্টের জিবনে নষ্ট হচ্ছে প্রবাসীদের জীবনের মানে। শুধুমাত্র তাদের পরিবারের সুখের জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে সকল দুঃখ ও কষ্ট মেনে নিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে প্রতিটি প্রবাসীর প্রবাস জীবনকাল। আর এই প্রবাসকালের অন্তরালে হারিয়ে গেছে প্রবাসীদের অনাকাঙ্খিত বাবার শাসন, মায়ের মুখের মধুর হাসি, বউয়ের মুখের মিষ্টি কথা, ছেলে মেয়েদের মিষ্টি কণ্ঠের বাবা ডাক, ছোট ভাই ও বোনের ভইয়া ডাক। তবে প্রবাসে প্রবাসীরা যে হাসে না তা নয়। তাঁরাও হাসে, তবে তাদের সে হাসি নির্মল কিংবা সুখের নয়। তাদের হাসির অন্তরালে থাকে একরাশ ছাইচাপা দুঃখ আর বেদনা। তাদের মুখে হাসি, বুকে ব্যথা আর চোখে থাকে জল।

নিজ দেশের আদর, ভালবাসা ও মায় মমতা ত্যাগ করে প্রিয়জনদের ছেড়ে জীবিকার তাগিদে তারা বাধ্য হয় প্রবাস জীবন বেছে নিতে। যদিও আমরা প্রবাসীদের মনে করি তারা বিদেশে থাকে, উন্নত ধারার জীবন যাপন করে থাকে। কিন্তু বাস্তবটা একটু ভিন্ন। কারন প্রবাসীদের অবস্থা বিদেশে অনেকটা চার দেয়ালের মতো হয়ে থাকে।  নিজ রাষ্ট্রের সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে তারা থাকে বঞ্চিত, এমনকি নিজেদের ভোটাধিকার ও তারা পায় না। তদ্রুপ বঞ্চিত তারা পারিবারিক সুবিধা থেকেও। বিদেশ যাওয়ার প্রথম ধাপ পাসপোর্ট দিয়ে দেশীয় বিমান বন্দরের সীমানা পার করে দেওয়ার পর কেউ থাকে না আর তাদের খবর রাখার।

প্রবাসীরা যে দেশে যায় সে দেশেও তাদের জন্য থাকে না সম্মান, ভালবাসা কিংবা শ্রদ্ধা। পক্ষান্তরে এই প্রবাসীরাই তাদের জীবনের সব সাধ-আহ্লাদ ত্যাগ করে নিজের জীবন প্রিয়জনের জন্য উৎসর্গ করে দিয়ে দেশ আর পরিবারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

প্রবাসীদের মধ্যে কেউ আবার ফেলেন দীর্ঘশ্বাস। তাদের অনেকেই যেন নানান ধরনের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যান। তাদের মনের মধ্য্যে কাজ করে অতীতের নানান ধরনের ভাবনা। মা-বাবা, বউ-বাচ্চা কিংবা ভাই বোনের সাথে কাটানো বিভিন্ন সময়ের ভাবনা তাদের কুড়ে কুড়ে খায়। আর এই এই ভিন্ন ভিন্ন ভাবনাগুলো কাদের জানেন? ভাবনাগুলো তাদেরই, যারা প্রবাসী।

আমরা দেশে বসে থেকেই প্রবাসীদের সম্পর্কে নানান ধরণা করে থাকি তাদের নিয়ে, আমাদের মধ্যে প্রবাসীদের সম্পর্কে বেশীরভাগই ধারণা হলো, প্রবাসী মানেই বুঝি শুধু টাকার মেশিন। বিদেশে শুধু টাকা আর টাকা। দেশের সকলের মনে প্রবাসীদের সম্পর্কে এই ধারণা পুরো অর্থকেন্দ্রিক হলেও তা শুধু অর্থকে ভালবেসে। প্রবাসীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে নয়। সুতরাং, আমাদের সকলের ধারণা যে, প্রবাসী মানে বিপুল সম্পদ তৈরীর যাদুকর। কিন্তু এই প্রবাসীরাই যে কত টা কষ্ট ত্যাগ করে প্রবাস জীবন অতিবাহিত করেন তা একমাত্র প্রবাসীরাই জানেন। তাদের সাথে সেখানে থাকে না কেউ হেসে কথা বলার মত, কেউ থাকে না অসুখে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মত, পরম মমতায় কারো ¯েœহাসেস হাতের পরশের কাঙালী মন কখনো পায় না মমতাময়ী মায়ের আদর।

সত্যি কথা বলতে প্রবাসীরা হলেন শত কষ্টেও চোখ বন্ধ করে নিরুপায় হয়ে কষ্ট সহ্য করার একটি পরিশ্রমী দল। যাদের অন্তরালে রয়েছে দিনভর কাজ করা আর কাশ শেষে লবনহীন রান্নার বৈচিত্রময় নিদারুন অভিজ্ঞতা অর্জন। বিদেশ গমনের পর থেকেই যার সঙ্গী হয় সেনাবাহীনির মত শৃংখলময় জীবন যাপন। অতচ নেই তার কোন অভিযোগ কিংবা অনুযোগ। যার প্রতিদিনের কাজ হয়ে দাড়ায় নিয়মমত উঠা কাজ করা আবার ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে উঠে পুনরায় কাজে যাওয়া। শত অবহেলায় সর্বদা যার মুখে লেগে থাকে প্রিয়জনকে সুখে রাখার জন্য অভিনয় করে মুখে আনা এক চিলতে মিছে হাসি। সেই তো প্রবাসী। যার জীবন কাটে ধুধু মরুর বুকে ধুধূ প্রন্তরে।

প্রবাসীরা কাজের বেলা সর্বদা থাকেন অটল। তারা কাজ করবে খরা রৌদ্রের রৌদ্রদীপ্ত বেলায়, প্রচন্ড শীতে, ঝড় ও ঝঞ্ঝায়। তাদের কাজের সময়কাল হয়ে থাকে ১২ ঘন্টা, ১৪ ঘন্টা কিংবা এর চেয়েও বেশি। কঠিন প্রাকৃতিক অনিয়মেও তাদের নেই নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ। আপন জনের মৃত্যূ তো পরে এমনকি মায়ের মৃত্যুতেও চাইলেও দেশে ফেরার নেই সুযোগ। নির্দিষ্ট নিয়ম ও বিধির মধ্যে পাওয়া যায় ছুটি। অন্যদিকে প্রবাসী যদি মারা যায় তাঁর লাশ নিয়ে পোহাতে হয় কতনা বিড়ম্বনা। কত শত নিয়ম কানুন ও আনুষ্ঠানিকতার পর সে লাশ দেশে পাঠানোর অনুমতি মিলে। রংতুলির রঙে আঁকা ভিন্ন ভিন্ন রুপের জীবনের সিংহভাগ সময় প্রবাসে কাটিয়ে অনেক প্রবাসীরই জীবনলীলা সাঙগ হয়ে শেষ নিঃশ্বাসটাও চলে যায় প্রবাসে, সে সময়ে পাশে থাকে না কোনো প্রিয়জন।

জীবনের নানান অপূর্ণতা নিয়ে, শত সহ¯্র মান অভিমান বুকে চেপে, কোন অভিযোগ বা অনুযোগ না রেখেই পৃথিবীকে বিদায় জানায় অনেকটা নিঃসঙ্গভাবেই। যে মানুষগুলোর জন্য এত আনুষ্ঠানিকতা, শ্রম, ত্যাগ আর ভালোবাসা সেই পিয় মানুষগুলো শেষ সময়ে থাকে না পাশে। হাজার মাইল দুরে বসে কাঁদতে হয় প্রিয়জনদের।। বাবা কাঁদে, কাঁদে গর্ভধারিণী মা। ভাই বোন ও আত্মীয়-স্বজন দূরদেশে কাঁদে। তাদের কান্নার আহাজারী তে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যায়। কিন্তু সেই কান্না তো আর পৌঁছায় না প্রবাসে। যে রংতুলি দিয়ে প্রবাসী বিদেশে যায় জীবন সাজাতে, সবার জীবন রঙিন করার দায়িত্ব নেয় নিজের কাঁধে, হয়তো একদিন সবার জীবন রঙিন হয় তার ঘাম ঝড়া অক্লান্ত পরিশ্রমে। কিন্তু সে চলে যায় প্রবাস থেকেও বহুদুরে। সেখান থেকেও শুনতে পাবে না আপন জনের কান্নার হৃদয় ভাঙ্গা কান্নার আওয়াজ, শুনতে পাবে না কারো আহাজারী। এরই নাম প্রবাস জীবন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *